শেখ সাদী (Sheikh Sa’di Shirazi) বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, কবি ও নীতিবিদ। তাঁর লেখা “গুলিস্তান” ও “বুস্তান” শুধু সাহিত্যকর্ম নয়, বরং মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও শেখ সাদীর উক্তিগুলো আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এই আর্টিকেলে আমরা শেখ সাদীর বিখ্যাত উক্তি, তার গভীর অর্থ ও জীবনে প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
এখানে আপনি পাবেন:
শেখ সাদী কে ছিলেন? (সংক্ষিপ্ত পরিচিতি)
শেখ সাদীর পুরো নাম আবু মুহাম্মদ মুশরিফউদ্দিন সাদি শিরাজি। তিনি ১২শ শতকে ইরানের শিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর চিন্তাধারা ইসলামিক দর্শন, মানবতা, নৈতিকতা ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ।
শেখ সাদীর উক্তি (ব্যাখ্যাসহ)
জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সৎকর্ম চিরস্থায়ী।
ব্যাখ্যা: মানুষের জীবন অল্প সময়ের হলেও তার ভালো কাজ সমাজ ও মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। সৎকর্মই মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
যে নিজের ভুল বুঝতে পারে, সে জ্ঞানীর পথে প্রথম পা রাখে।
ব্যাখ্যা: আত্মসমালোচনা ও ভুল স্বীকার করার মানসিকতাই প্রকৃত জ্ঞানের শুরু।
অশিক্ষিত মানুষ অন্ধ নয়, বরং নীতিহীন মানুষ প্রকৃত অন্ধ।
ব্যাখ্যা: শিক্ষা না থাকলেও নৈতিকতা থাকলে মানুষ আলোকিত হতে পারে, কিন্তু নীতিহীনতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়।
যে অন্যের দুঃখে কাঁদে না, সে মানুষ নামে অযোগ্য।
ব্যাখ্যা: সহানুভূতি ও মানবিকতা ছাড়া মানুষ হওয়া অসম্পূর্ণ।
ধৈর্য তেতো, কিন্তু তার ফল মিষ্টি।
ব্যাখ্যা: জীবনের কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ করলে শেষ পর্যন্ত সফলতা ও শান্তি আসে।
ঝড়ের পরেই আকাশ সবচেয়ে পরিষ্কার হয়।
ব্যাখ্যা: দুঃখ ও বিপদের পরেই জীবনে নতুন আশার আলো দেখা দেয়।
জ্ঞান অর্জন করো, কারণ জ্ঞানই মানুষের প্রকৃত অলংকার।
ব্যাখ্যা: ধন-সম্পদ নষ্ট হতে পারে, কিন্তু জ্ঞান মানুষের আজীবন সঙ্গী।
যে কম জানে কিন্তু বেশি কথা বলে, সে বিপদের কারণ।
ব্যাখ্যা: অল্প জ্ঞান ও অহংকার একসাথে থাকলে তা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
দারিদ্র্য লজ্জার নয়, কিন্তু অলসতা লজ্জার।
ব্যাখ্যা: দারিদ্র্য পরিস্থিতি হতে পারে, কিন্তু চেষ্টা না করা প্রকৃত ব্যর্থতা।
অহংকার মানুষকে এতটাই অন্ধ করে যে সে নিজের পতন দেখতে পায় না।
ব্যাখ্যা: অহংকার মানুষকে আত্মবিনাশের দিকে ঠেলে দেয়।
সমস্ত মানুষ এক দেহের অঙ্গ; এক অঙ্গে ব্যথা হলে সব অঙ্গ কষ্ট পায়।
ব্যাখ্যা: মানবজাতি পরস্পরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত—একজনের কষ্ট সবার কষ্ট।
যে নিজেকে সবার চেয়ে বড় মনে করে, সে আসলে সবার চেয়ে ছোট।
ব্যাখ্যা: বিনয়ই মানুষের প্রকৃত বড়ত্বের পরিচয়।
নীরবতা অনেক সময় শ্রেষ্ঠ উত্তর।
ব্যাখ্যা: সব পরিস্থিতিতে কথা না বলে নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
বন্ধু চিনতে চাইলে বিপদের সময় তাকে দেখো।
ব্যাখ্যা: প্রকৃত বন্ধুত্ব সুখে নয়, বিপদেই প্রকাশ পায়।
জ্ঞানী মানুষ কথা কম বলে, কিন্তু অর্থবহ কথা বলে।
ব্যাখ্যা: জ্ঞানী ব্যক্তি অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলে।
নীরব মানুষকে দুর্বল ভেবো না, সে গভীর।
ব্যাখ্যা: নীরবতার আড়ালেই অনেক সময় গভীর চিন্তা ও প্রজ্ঞা লুকিয়ে থাকে।
যে কম কথা বলে, সে বেশি বোঝে।
ব্যাখ্যা: পর্যবেক্ষণ ও শোনার ক্ষমতাই প্রকৃত বোঝাপড়ার চাবিকাঠি।
বন্ধু সে-ই, যে বিপদে ছায়া হয়।
ব্যাখ্যা: প্রকৃত বন্ধু দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায়।
রাগ মানুষের বুদ্ধিকে গ্রাস করে।
ব্যাখ্যা: রাগ মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
অল্পে তুষ্ট থাকা সবচেয়ে বড় ধন।
ব্যাখ্যা: সন্তুষ্ট মনই প্রকৃত সুখের উৎস।
যে সময়ের মূল্য বোঝে, সে কখনো দরিদ্র হয় না।
ব্যাখ্যা: সময়ের সঠিক ব্যবহার মানুষকে সফল করে তোলে।
অজ্ঞ বন্ধু জ্ঞানী শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর।
ব্যাখ্যা: ভুল পরামর্শ দেওয়া বন্ধু বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
নিজেকে জয় করাই সবচেয়ে বড় বিজয়।
ব্যাখ্যা: আত্মনিয়ন্ত্রণই মানুষের শ্রেষ্ঠ সাফল্য।
যে নিজের ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে নিজেকেও পারে না।
ব্যাখ্যা: কথার নিয়ন্ত্রণ মানেই চরিত্রের নিয়ন্ত্রণ।
মানুষ তার কথায় নয়, তার কাজে পরিচিত হয়।
ব্যাখ্যা: কাজই মানুষের প্রকৃত পরিচয় বহন করে।
অহংকার জ্ঞানকে ঢেকে দেয়।
ব্যাখ্যা: অহংকারী মানুষ নতুন কিছু শিখতে পারে না।
ভালো চরিত্র উত্তম বংশের চেয়েও মূল্যবান।
ব্যাখ্যা: চরিত্রই মানুষের আসল পরিচয়, বংশ নয়।
যে ক্ষমা করতে পারে, সে-ই প্রকৃত শক্তিশালী।
ব্যাখ্যা: ক্ষমা দুর্বলতা নয়, বরং আত্মিক শক্তির প্রমাণ।
অল্প বিদ্যা অহংকার বাড়ায়।
ব্যাখ্যা: অসম্পূর্ণ জ্ঞান মানুষকে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
আরও পড়ুন:
শেখ সাদীর কবিতা (বাংলা)
নিচে শেখ সাদীর (Sheikh Sa‘di Shirazi) বিখ্যাত কবিতার বাংলা ভাবানুবাদ/কবিতারূপ একসাথে দেওয়া হলো।
নোট: এগুলো শেখ সাদীর মূল ফারসি কবিতার ভাবানুবাদ (Poetic Translation), যাতে অর্থ ও সৌন্দর্য বজায় থাকে।
১. মানবতা নিয়ে কবিতা (গুলিস্তান)
মানুষ এক দেহের অঙ্গসমান,
এক সৃষ্টিতে বাঁধা সবার প্রাণ।
এক অঙ্গে যদি ব্যথা লাগে,
অন্য অঙ্গও শান্তি না পায় জান।
ভাবার্থ:
সমস্ত মানবজাতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজনের কষ্ট মানেই সবার কষ্ট।
২. চরিত্র ও নৈতিকতা
রূপে নয়, গুণেই মানুষ বড়,
চরিত্রহীন জ্ঞান বৃথা সব।
সোনার পাত্রে বিষ থাকিলে,
মূল্য তার শূন্য সমতুল্য ভাব।
ভাবার্থ:
চরিত্র ছাড়া শিক্ষা ও বাহ্যিক সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই।
৩. ধৈর্য নিয়ে কবিতা
ধৈর্যের পথ কঠিন বটে,
তবু শেষ প্রান্তে সুখ।
কাঁটার পথ পেরোলে পরে,
ফুটে ওঠে শান্তির ফুলমুক।
ভাবার্থ:
ধৈর্য কষ্টকর হলেও এর ফল চিরসুখকর।
৪. অহংকার সম্পর্কে
অহংকারে যে মাথা তোলে,
সে পতনের পথই গড়ে।
নত হওয়া শেখে যে জন,
সাফল্য তার কাছে ঝরে।
ভাবার্থ:
অহংকার মানুষকে ধ্বংসের দিকে নেয়, বিনয় তাকে উচ্চতায় তোলে।
৫. জ্ঞান ও প্রজ্ঞা
জ্ঞান সে আলো, নিভে না কভু,
চুরি হয় না, কমে না তাতে।
ধন গেলে দুঃখে ভাসো তুমি,
জ্ঞান থাকলে ভয় কিসে তাতে?
ভাবার্থ:
জ্ঞানই মানুষের প্রকৃত সম্পদ—যা কখনো হারায় না।
৬. নীরবতা নিয়ে কবিতা
নীরবতাও ভাষা বটে,
জ্ঞানীর মুখে সে-ই সাজে।
মূর্খ যত কথা বাড়ায়,
জ্ঞানী তত নীরব থাকে।
ভাবার্থ:
বেশি কথা জ্ঞানের লক্ষণ নয়; নীরবতাই প্রজ্ঞার পরিচয়।
৭. বন্ধুত্ব নিয়ে কবিতা
সুখে যারা পাশে থাকে,
সবাই বন্ধু নয় হে প্রাণ।
বিপদে যে ছায়া হয়,
সেই জানে বন্ধুত্বের মান।
ভাবার্থ:
প্রকৃত বন্ধু চেনা যায় বিপদের সময়।
৮. জীবনবোধ
জীবন ক্ষণিক, সময় নদী,
বইছে নিরবধি কাল।
সৎকর্ম যদি সঙ্গী থাকে,
মৃত্যুও হার মানে তবু ভাল।
ভাবার্থ:
জীবন ছোট হলেও সৎকর্ম মানুষকে অমর করে।
৯. ক্ষমা ও মহানুভবতা
ক্ষমা যে করে শক্ত সে জন,
দুর্বল নয় সে কভু।
প্রতিশোধে জ্বলে যে হৃদয়,
সে-ই হারায় মানবতাবোধ সবু।
ভাবার্থ:
ক্ষমাই প্রকৃত শক্তির পরিচয়।
১০. সময় ও শ্রম
সময় গেলে ফেরে না আর,
বুঝে নাও হে মন।
অলস জন কাঁদে শেষে,
শ্রমী পায় সাফল্য ধন।
ভাবার্থ:
সময় ও পরিশ্রমের সঠিক ব্যবহারই সফলতার চাবিকাঠি।
উপসংহার
শেখ সাদীর উক্তি শুধু অতীতের সাহিত্য নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক চিরন্তন পথনির্দেশক। তাঁর বাণীতে রয়েছে জীবনবোধ, নৈতিকতা, মানবতা ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা।
যদি আমরা শেখ সাদীর অন্তত কয়েকটি উক্তি বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারি, তবে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।


